হযরত আবু বকর (রা.)-এর বিজয় অভিযানসমূহ

মুসলিম ইতিহাসে খিলাফতে রাশেদার প্রথম খলীফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামল ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ও সংহতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সময়েই ইসলামী রাষ্ট্র পারস্য ও সিরিয়ার দিকে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে এবং মুসলিম বাহিনী ধারাবাহিক বিজয় অর্জন করে।

পারস্য অভিযান

রিদ্দা যুদ্ধ চলাকালীন পারস্যবাসীরা বিদ্রোহীদের সহায়তা প্রদান করেছিল। ফলে ভবিষ্যতে মদীনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এটি একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে খলীফা আবু বকর (রা.) পারস্যে সামরিক অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন মুসান্না ইবনে হারিসা, যার অধীনে প্রায় ৮,০০০ সৈন্য ছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তখন খলীফা বিখ্যাত সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে প্রেরণ করেন। উভয় বাহিনী উবাল্লা নামক স্থানে মিলিত হয়ে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয় এবং পারস্যবাহিনীর মোকাবেলায় অগ্রসর হয়।

হাফিরের যুদ্ধ

পারস্যবাহিনীর সাথে মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ ঘটে হাফিরের যুদ্ধ-এ, যা “শৃঙ্খলের যুদ্ধ” নামেও পরিচিত। এই যুদ্ধে পারস্য সেনারা নিজেদেরকে শৃঙ্খলের মতো বেঁধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিল। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে এবং পারস্য সেনাপতি হরমুজ নিহত হন। এই বিজয়ের ফলে মুসলিমদের পারস্য অভিযানের পথ সুগম হয়ে যায়।

The Lady Castle (মহিলা দুর্গ)

হাফিরের যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী ফোরাত (ইউফ্রেটিস নদী) নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে অগ্রসর হয়। সেখানে এক রাজকুমারীর নেতৃত্বাধীন একটি দুর্গ মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়। ইতিহাসে এই দুর্গটি “The Lady’s Castle” নামে পরিচিত, যা মুসলিম বিজয়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

হীরা বিজয়

পরবর্তীতে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) উলিসের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করে হীরা নগরী অধিকার করেন। হীরার শাসক মুসলিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং খলীফার আনুগত্য স্বীকার করে। এই সময় হীরার খ্রিস্টান অধিবাসীদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করা হয় এবং তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

আনবার দখল

হীরা বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী ফোরাত নদীর তীরবর্তী আনবার দখল করে। এরপর ধারাবাহিকভাবে আইনুত্-তামার ও দুমা অঞ্চলেও মুসলিম বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

সিরিয়া অভিযান

সিরিয়া তখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য-এর অধীনে ছিল এবং এর শাসক ছিলেন হিরাক্লিয়াস। রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় তিনি মুসলিম দূতকে সম্মান দেখালেও পরবর্তীতে তার মনোভাব পরিবর্তিত হয়। তিনি রিদ্দা যুদ্ধে বিদ্রোহীদের উস্কানি দেন এবং সীমান্তবর্তী গোত্রগুলোর সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ফলে খলীফা সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।

আজনাদাইনের যুদ্ধ

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার আজনাদাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন—

  • আমর ইবনে আল আস
  • শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ
  • ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান
  • আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ

মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬,০০০, অপরদিকে রোমান বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ। প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধের পর হিরাক্লিয়াস পলায়ন করে এন্টিয়কে আশ্রয় নেয় এবং মুসলিমরা দামেস্ক দখল করে। এ সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) হীরা থেকে এসে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

উপসংহার

খলীফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম রাষ্ট্র কেবল অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনেই সফল হয়নি, বরং পারস্য ও সিরিয়ার মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও বিজয় অর্জন করে ইসলামের পতাকা সুদূরপ্রসারী করে তোলে।

হযরত আবু বকর (রা.) এর প্রাথমিক জীবন ও ও খিলাফত লাভ

বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে আবু বকর (রা.)-ই সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেন। ইসলাম গ্রহণের পর মহানবী (স.) এর জীবদ্দশায় তিনি ইসলাম রক্ষায় নিজ সমুদয় সম্পদ যেমন দান করেছিলেন তেমনি খিলাফতে আসীন হয়ে অন্যায়ের সাথে কোন প্রকার আপোষ করেননি। একারণেই তাকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন

হযরত আবু বকর (রা.) মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের তায়িম গোত্রে ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাল্যনাম ছিল আবদুল্লাহ; ডাক নাম ছিল আবু বকর (কুনিয়া)। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি ‘সিদ্দীক (বিশ্বাসী)’ খেতাব লাভ করেন। আবু বকর (রা.) এর পিতার নাম ছিলো আবু কোহাফা এবং মাতার নাম ছিল উম্মুল খায়ের সালমা। যৌবনে আবু বকর তাঁর নৈতিক আদর্শের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি লেখাপড়া জানতেন। আবু বকর (রা.) পেশায় একজন কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের সেবা

বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে আবু বকর (রা.) ই সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মানুষকে ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিলেন। তখন আবু বকর (রা.) বিনা দ্বিধায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তার প্রচেষ্টায় অনেকেই ইসলাম কবুল করেন এবং হযরত বিলাল (রা.) সহ অনেক দাসকে তিনি শৃঙ্খলামুক্ত করেন। হযরত উমর (রা.) বলেন-ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর “ইসলামের সেবায় আবু বকরকে কেউ অতিক্রম করেতে পারেনি।”

মহানবী (সা.) এর প্রতি ভক্তি

৬২২ খ্রিস্টাব্দের হযরত আবু বকর (রা.) মহানবী (সা.) এর সাথে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি বদর, উহুদ, খন্দক ও হুনাইনের যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) এর অসুস্থতার সময় তাঁর স্থলে ইমামতি করেন। এতে বুঝা যায় যে, নবীজী (সা.) আবু বকর (রা.) কেই তাঁর অবর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত বলে মনে করতেন।

সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব

মহানবী (সা.) এর কোন পুত্র সন্তান জীবিত ছিল না। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন বলে তিনি তাঁর ওফাতের সময় উত্তরাধিকারীও মনোনীত করে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পর কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন? এই প্রশ্ন নিয়ে মুসলিম জাহানে এক বিরাট সমস্যা দেখা দিল [ পি.কে হিট্টি বলেন- “The caliphate is therefore the first problem Islam had to face.” এই প্রশ্নে মুসলিমগণ আনসার ও মুহাজীর এই দুইটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মদীনার সংকটময় পরিস্থিতির আনসারগণ সাদ বিন ওবায়দাকে এবং একদল মুহাজীর হযরত আলী (রা.) কে উক্ত পদের জন্য মনোনীত করেন।

খিলাফত লাভ

ইসলামের সংকটময় সময়ে হযরত উমর (রা.) এবং আবু উবায়দাকে সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর (রা.) সহ ছাকিফা বানী সায়িদা গৃহে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে হযরত উমর (রা.) বয়স, অবস্থান, পদমর্যাদা, সম্মান ইত্যাদি বিবেচনা করে হযরত আবু বকর (রা.) কে ইসলামের প্রথম খলীফা বলে ঘোষণা করে তাঁর হাত স্পর্শ করে বায়াৎ গ্রহণ করেন। সাদ ব্যতীত সমস্ত মহল হতে মুসলিম জনতা তাঁকে খলীফা বলে অভিবাদন জানাল।

খলীফার উদ্বোধনী ভাষণ

খলীফা নির্বাচিত হবার পর হযরত আবু বকর (রা.) সকলের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর এই ভাষণে গণতান্ত্রিক চেতনা ফুটে উঠেছে যা ছিল আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মূল বক্তব্য। এতে খলীফার স্বৈরাচারী মনোভাবের নিষিদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা মূলক শাসন ব্যবস্থার স্বরুপ প্রকাশ পেয়েছে। আর সকল কিছুর উর্ধ্বে ইসলামী শরীয়তের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.) এর খলীফা নির্বাচনে মুসলিম বিশ্বের প্রথম ভয়াবহ সংকট দূরীভূত হয়। তাঁর নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় হয়। এর পর থেকে মুসলিম বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের সূত্রপাত হয়। তাঁর খিলাফত প্রাপ্তি যুক্তিসঙ্গতও ছিল। ইসলামের জন্য তিনি যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন এবং দূরদর্শিতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ধর্মপরায়ণতা এবং অন্যান্য গুণে তিনি নিঃসন্দেহে অধিক উপযুক্ত ছিলেন। খলীফা হওয়ার পর আবু বকর (রা.) সমবেত মুসলিমদেরেকে উদ্দেশ্যে করে ভাষণ প্রদান করেন। উদ্বোধনী ভাষণের মাধ্যমে তিনি খলীফা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা জনগণকে অবহিত করেন। একজন খলীফাকে যে স্বেচ্ছাচারী নীতির পরিপন্থী ও গণতান্ত্রিক আদর্শ অনুসরণ করতে হয় তা তিনি অকপটে প্রকাশ করেন এবং তিনি যে ইসলামী শাসন প্রবর্তনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দান করেন।