ভূমিকা: পৃথিবীতে বিদ্যমান সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর মধ্যে আরবি ভাষার অবস্থান অনন্য এবং এর প্রয়োজনীয়তা সর্বাগ্রে। বর্তমান বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অনুধাবন করা যায় যে, আরবি ভাষা শিক্ষা ও এতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কীভাবে সামগ্রিক উন্নতি সাধন সম্ভব। নিচে এর বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো:
১. ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও আত্মশুদ্ধি
ইসলামের মূল উৎস তথা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও আল-হাদিসের ভাষা আরবি। ধর্মীয় জ্ঞানে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে এবং পরিপূর্ণ হেদায়েত লাভ করতে হলে আরবি ভাষা জানার কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই ভাষাকেই মানবজাতির জীবনবিধানের মাধ্যম হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন।
আমাদের ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের যাবতীয় দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে বুঝতে এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে আরবি ভাষা জানা আবশ্যক। শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, কুরআন যেহেতু সমগ্র মানবজাতির দিশারী, তাই সত্যের অনুসন্ধানে যে কারো জন্যই এই ভাষা শেখা গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি সার্জন ও গবেষক ড. মরিস বুকাইলি মদিনায় দীর্ঘ আট বছর অবস্থান করে আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন; এরপর আল-কুরআন নিয়ে গবেষণা করেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
২. জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকর
আরবি ভাষা হচ্ছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এক মহাসমুদ্র। মধ্যযুগে চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও দর্শনের মতো মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সিংহভাগ চর্চা ও সংরক্ষণ হয়েছে আরবি ভাষায়। এই ভাষার গভীরতা ও সাহিত্যিক সমৃদ্ধি অনুধাবন করার মাধ্যমে প্রাচীন ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডারে প্রবেশ করা সম্ভব হয়।
৩. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
আজকের বাংলাদেশ যে বৈদেশিক রেমিট্যান্স নিয়ে গর্ব করছে, তার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশসমূহ থেকে। তবে যথাযথ ভাষা শিক্ষার অভাবে আমাদের কর্মীরা সেখানে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পান না। আমরা যদি সাধারণ জনশক্তির পাশাপাশি ভাষা-দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি, তবে বিদেশে আমাদের কর্মসংস্থানের পরিধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
৪. দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
বর্তমান আরব দেশগুলোর আইসিটি খাত, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বেশিরভাগ বড় শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনায় ভারতসহ অন্যান্য অমুসলিম দেশের দক্ষ পেশাজীবীরা আধিপত্য বিস্তার করছেন। কাজের দক্ষতার পাশাপাশি “কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ” হিসেবে আরবি ভাষায় পারদর্শিতাই আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের এই উত্থানের মূল চাবিকাঠি। অথচ বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ শুধু ভাষা না জানার কারণে এই প্রতিযোগিতায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাণিজ্যের প্রসারের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আরবিকে অন্যতম প্রধান ‘Trade Language’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৫. কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন
আরব দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে হলে আরবি ভাষা চর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। আরব বিশ্ব ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও উন্নয়নমূলক খাতে প্রচুর আর্থিক অনুদান ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে। দক্ষ আরবি ভাষী তৈরি করার মাধ্যমে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও ফলপ্রসূ ও দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব।
৬. ভ্রান্ত ধারণা নিরসন ও সঠিক উপস্থাপন
আরবি ভাষা সরাসরি বোঝার ক্ষমতা থাকলে দ্বীন বা ধর্ম নিয়ে যেকোনো বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। এর ফলে আল-কুরআন ও হাদীসের বাণী মানুষের সামনে সহজ, সাবলীল ও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।
৭. সাহিত্যের কালজয়ী ঐতিহ্য
পৃথিবীতে বহু ভাষার জন্ম ও বিলুপ্তি ঘটেছে, কিন্তু আরবি ভাষা হাজার বছর ধরে তার আপন মহিমায় সমুন্নত রয়েছে। আরবি কবিতা ও সাহিত্য বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সমৃদ্ধতম সাহিত্যিক নিদর্শনগুলোর অন্যতম, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ প্রাক-ইসলামী যুগের বিখ্যাত সপ্ত ঝুলন্ত কবিতা বা ‘সাবউল মুয়াল্লাকাত’। এই কালজয়ী সাহিত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি আরবি ভাষার সংস্পর্শে এসে অন্যান্য ভাষার সাহিত্যও সমৃদ্ধ হয়েছে।
উপসংহার:
একটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আরবি ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। কেবল ধর্মীয় কারণেই নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গঠন এবং বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরবি ভাষা চর্চার প্রসার ঘটানো এখন সময়ের দাবি।